শহুরে দরিদ্র মহিলাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিঃ ব্রাক, টার্গেটিং আলট্রা পুওর (টি.ইউ.পি)
অনুবাদকঃ ফারজানা নওশিন এবং নুসরাত ইয়াসমিন
বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নতির জন্য মহিলাদের অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ প্রধান চাবিকাঠি। শহরাঞ্চলের মহিলারা বিশেষত যারা ঢাকায় বাস করেন, তারা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন জটিল সমস্যার মুখোমুখি হন যেমন নারী সহিংসতা, অপুষ্টি এবং গর্ভকালীন শারীরিক জতিলতা; এসকল সমস্যার অন্যতম কারণ নারীদের অনেকসময়ই পরিবারের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে বঞ্চিত করা হয়। মহিলারা ঘরের সকল কাজ করে এবং ঘরের বাইরেও তাদের কাজের সুযোগ ও চাহিদা বেড়ে যাচ্ছে; কিন্তু এসকল কাজের বিনিময়ে তাদের উপযুক্ত মজুরি দেয়া হচ্ছে না। সুতরাং, বাংলাদেশ এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য অর্থনীতিতে মহিলাদের অংশগ্রহন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং তাদের অংশগ্রহণের জন্য যথাশীঘ্র প্রয়োজনীয় আইন তৈরি করা উচিত।
ঢাকার বস্তিতে বসবাসরত মহিলারা সাধারণত অর্থনৈতিক ব্যাবস্থার ব্যাবহার সঠিক ভাবে করতে পারেন না; অপরুন্তু ডোনার এবং এন জি ও এর কাছ থেকে যে পরিমান অর্থ আসে তা এই বস্তির মহিলারা পান না, কারণ ডোনার এবং এন জি ও এসব বস্তি মূল্যায়ন করে না। এসব মহিলারা কোন ধনশম্পত্তিও পান না এবং তারের কোন ভুমি অধিকারও থাকে নাহ। বস্তুত, খাদ্য এবং কৃষি জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে কেবল ২% মহিলা ভুমির মালিক, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অত্যন্ত কম। মহিলারা পার্লামেন্টে এবং অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে এখন কাজ করলেও ভূমিমালিকাধীন নারীর সংখ্যা এখনো অনেক কম, যা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মহিলাদের ভুমিঅধিকার তাদেরকে অর্থনৈতিক ভাবে সবল করে তুলবে এবং তাদেরকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে কর্মস্থলে সহকর্মীদের সাথে কাধে কাধ মিলিয়ে কাজ করার। বাংলাদেশে ব্রাক এবং বাংলাদেশ ব্যাংক মহিলাদের ভূমিমালিকানা নিয়ে সক্রিয় ভাবে কাজ করছে। ঢাকার বস্তিবাসীদের এলাকায় চরম দারিদ্র্য মোকাবেলার, ব্র্যাক "দারিদ্র্য হ্রাস এর সীমানা চ্যালেঞ্জিং" তার প্রোগ্রাম শুরু করছে যা ২০০২ সালের টার্গেটিং আল্ট্রা খারাপ (TUP) এর একটি অংশ।এটির মিশন চরম দারিদ্রে বাস করা মানুষদের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষমতার উন্নয়ন করা। এটি প্রথমে গ্রামকেন্দ্রিক প্রোজেক্ট ছিল কিন্তু এর সাফল্যর জন্য এটি এখন শহরাঞ্চলেও কাজ করে। টি ইউ পি প্রোজেক্ট মহিলাদের উপর বেশী প্রাধান্য দেয় কারণ ব্রাক বিশ্বাস করে যেহেতু মহিলারা সবসময়ই ঘরের কাজ করে এবং কম অর্থের অধিকারী হয় তাই তাদের কথার সমাজে মূল্যায়ন পাওয়ার সম্ভাবনা বেশী।
প্রকল্প শুরু করার আগে, ঢাকার সবচেয়ে অসহায় মহিলাদের সনাক্ত করার জন্য ঢাকার জুরাইন ও মোহাম্মদপুর এলাকাই একটি জরিপ চালানো হয়। এই দুই বস্তি থেকে প্রাথমিকভাবে ১০০ পরিবারকে বাছাই করা হয়, এবং ২০১২ সালের এপ্রিলে আরও তেরটি ভিন্ন বস্তিকে এই প্রোগ্রামের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই বস্তিগুলোর মধ্য থেকে টিইউপি প্রোগ্রাম এমন ৩০০ পরিবারকে নির্বাচন করে যার সদস্যরা দীর্ঘস্থায়ী ক্ষুধা, অপর্যাপ্ত আশ্রয়, এবং শহুরে ও মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। নির্বাচিত নারীদের সম্পদ স্থানান্তর, এন্টারপ্রাইজ উন্নয়ন ও পৃষ্ঠপোষকতার উপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ব্র্যাকের এই প্রোগ্রামের উপর তৈরীকৃত মূল্যায়ন প্রতিবেদন থেকে দেখা যাই, মহিলাদের মধ্যে সম্পদ স্থানান্থরের পরেও সম্পদ ধারণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। সম্পদ স্থানান্থর, টিইউপি প্রোগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কারণ এটি মহিলাদের পশু-মালিক হতে এবং ব্যবসায় মূলধন নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। প্রশিক্ষিত হওয়ার পর মহিলারা টিইউপি প্রোগ্রামের পৃষ্ঠপোষকতায় নিজস্ব ব্যবসা শুরু করতে পারেন।
যদিও আরবান টিইউপি প্রোগ্রাম এখনো প্রাথমিক অবস্থায় রয়েছে, এরই মধ্যে তা সুবিধাভোগীদের জীবনে ইতিবাচক প্রভাবী হিসেবে প্রমাণিত করেছে। উদাহরণস্বরূপ, এক মহিলা চা ব্যবসায়ী টিইউপি প্রোগ্রামের পৃষ্ঠপোষকতায় তার আয় স্বল্পসময়ে ১০০ টাকা থেকে ৪০০ টাকায় উন্নীত করেছে। উপরন্তু, প্রোগ্রামের স্বাস্থ্য বিভাগ মহিলাদের সুস্থ ও সক্রিয় রাখবার জন্য স্বাস্থ্য সুবিধা প্রদান করে যাচ্ছে যাতে কেউ যেন মাঝপথে কাজ ছেড়ে না দেয়। এক কথায়, ব্র্যাকের আরবান টিইউপি প্রোগ্রামের প্রশিক্ষণ ও আর্থিক ইনসেনটিভ শক্তি প্রমাণ করে, আর্থ-সামাজিক অবস্থান ও ঢাকার জমি মালিকানা সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব।
Photo credit: BRAC Communications
