![]() |
শক্ষুদ্রঋণের আদিকথা
লেখকঃ কৃতিকা কুমারী, অনুবাদকঃ ফারজানা নওশিন এবং নুসরাত ইয়াসমিন
আজকের দিনের সবচেয়ে প্রচলিত এবং সফল দারিদ্রদূরীকরণ পন্থার উদ্ভব হয়েছে প্রাচীন বন্দর নগরী চট্রগ্রামে। ১৯৭৬ সালে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস উপলব্ধি করেন যে গ্রামের অনেক গরীব মানুষ ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে নিজেদের ব্যবস্যা শুরু করতে পারে যা একসময় তাদের দারিদ্র দূর করে আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে সাহায্য করবে। ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প সর্বপ্রথম চট্রগ্রামের জোবরা গ্রামে ছোট পরীক্ষামূলক আকারে চালু করা হয়। জোবরা গ্রামে ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পের সাফল্যের পরে ডঃ উইনুস গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে বড় আকারে ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প চালু করেন। তখন থেকেই গ্রামীণ ব্যাংক চট্টগ্রাম এবং চট্রগ্রামের বাইরের এলাকার দারিদ্র্যদূরীকরণে সাফল্যের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। গ্রামীণ ব্যাংকের ২৫৬৪ টি শাখা রয়েছে এবং এটি ১০০০ টির চেয়েও বেশী এন.জি.ও কে ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে সহায়তা করেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে চট্রগ্রামে ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা কেন আজকের দিনেও জরুরি?
প্রথমত, চট্রগ্রামের এবং বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের গরীব মানুষদের সুযোগ থাকলে রাজধানী ঢাকায় চলে একটি প্রবণতা আছে, কারণ তারা মনে করে যে ঢাকায় গেলে চাকরি পাওয়া যাবে যা তাদের দারিদ্র্য দূর করতে সাহায্য করবে। এর ফলাফলে ঢাকার জনসংখ্যা বেড়ে যায় এবং জীবনযাত্রার মান কমিয়ে দেয়। জনসংখ্যার ঘনত্বের দিক থেকে ঢাকা পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর যার উন্নয়ন প্রকল্প সমূহ প্রায়ই অবহেলিত হয়ে থাকে। ঢাকায় উনুয়ন এবং জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করার জন্য চাকরির অনিশ্চয়তার পরেও এখানে নতুন মানুষের আগমন থামানো, তথান্তু চট্রগ্রামের দারিদ্র্য দমন করা জরুরি হয়ে পরেছে। দ্বিতীয়ত, চট্রগ্রাম অনেক আদিবাসী মানুষের বাসস্থান কিন্তু তাদের মধ্যে সাধারন মানুষের সাথে কম কাজ করার প্রবণতা আছে। উপরন্তু, সরকার বা অন্যান্য সংস্থার কাছ থেকেও কোন বিশেষ সাহায্য আসছে না যা আদিবাসীদের সামাজিক এবং আর্থিক উন্নয়নের জন্য সাধারণ মানুষের সাথে কাজ করার উৎসাহ দিবে। এই অবস্থায় গ্রামীন ব্যাংক এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, যদিও গ্রামীণ ব্যাংক এর চেয়েও বেশী কাজ করার ক্ষমতা রাখে। এইজন্য ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণের কর্মসূচি অব্যাহত রাখা উচিত।
অন্যান্য ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী এনজিও ব্র্যাক, আশা, এবং প্রশিকার মত গ্রামীণও চট্টগ্রামের দারিদ্র্য সমস্যা মোকাবেলার জন্য উল্লেখযোগ্য প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রায় ১৩ মিলিয়ন পরিবারে ঋণ প্রদান করেছে। তাদের কৌশল সফলের বেশকিছু কারণ হলঃ
১। দরিদ্রদের মধ্যে ঋণ বিস্তারঃ চট্টগ্রামের ৬০% এর মত জনসংখ্যা গ্রামীণ। চাষ থেকে সীমিত উপার্জনের কারণে কৃষকদের মাঝে শহরে চলে আসা এবং শ্রমিক হিসেবে কাজ করবার প্রবণতা দেখা যায়। তাই এই অস্বাস্থ্যকর অভিবাসন সমস্যা এড়ানোর জন্য, ক্ষুদ্রঋণ, কোনো প্রকার সম্পদ বন্ধক রাখা ছাড়া অল্প কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প প্রসারণ করেছে, যাতে কৃষকরা তাদের গ্রামে ছোট ব্যবসা শুরু এবং একটি সম্মানজনক আয় উপার্জন করতে পারে।
২। সহজ পদ্ধতিঃ চট্টগ্রামে শিক্ষার হার মাত্র ৩২.০৮%। কাজেই, কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ এক প্রকার অসম্ভবই বলা চলে। এই বাধা মেনে নিয়ে, গ্রামীণ ব্যাংক সহজ পদ্ধতি অবলম্বনের মাধ্যমে এই ব্যক্তিদের জন্য ঋণের জন্য আবেদন ও পরিশোধ করবার প্রশিক্ষণ অব্যাহত রেখেছে।
৩। সঞ্চয় ব্যবস্থাসমূহঃ চট্টগ্রাম একটি বন্যা, ঝড় এবং ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা। তাছাড়া এখানকার চাষ বর্ষা মৌসুমের উপর সবসময় নির্ভরশীল হভার কারণে ভাল ফসল পাওয়া অনিশ্চিত। তাই জরুরী সময়ের জন্য কিছু অর্থ জমানো অত্যাবশ্যক। ক্ষুদ্রঋণ অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানগুলো এই দিকটাতে নজর দিতে আরম্ভ করেছে যার-ই পদক্ষেপ স্বরূপ জরুরি অবস্থায় জন্য দলের তহবিল থেকে ৫% সরিয়ে রাখা এবং প্রতিটি সদস্যকে অল্প পরিমাণ সাপ্তাহিক সঞ্চয়ের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়
৫। নারী ক্ষমতায়ন এবং হিউম্যান ডেভেলপমেনটঃ চট্টগ্রাম অপেক্ষাকৃত রক্ষণশীল মুসলিম শহর এবং মাইক্রো-ফিন্যান্স প্রতিষ্ঠানসমূহ এই আশায় মহিলাদের লক্ষ্য করে যে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়াবে। বাস্তবে, গ্রামীণ এর গ্রাহকদের ৯৭% নারী।
এই কৌশলসমূহ অনেক বাংলাদেশীদের ক্ষেত্রে অতিশয় শক্তিশালী প্রমাণিত হয়েছে যাদের পূর্বে বিনিয়োগের কোনো সুযোগই ছিল না। যদিও গ্রামীণ এর ঋণ সিস্টেম এখন ৫০ টিরও বেশি দেশে অনুকরন করা হয়েছে, তারপরও এই প্রোগ্রাম চট্টগ্রামের দরিদ্র সম্প্রদায়, বিশেষ করে আদিবাসী সম্প্রদায়ের কাছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় পৌঁছাতে পারে নি। মাইক্রো-ফাইনান্স চট্টগ্রামের দরিদ্রগোষ্ঠীকে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং নগর উন্নয়নের একটি অংশ হতে সাহায্য অব্যাহত রাখবে।
Photo credit: pearsonfoundation

